টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি)-এর প্রকোপ বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক গরু আক্রান্ত হওয়ায় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি, জ্বর, ক্ষুধামন্দা ও দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সরেজমিনে উপজেলার ইছাদিঘী, কলমেঘা, বড়চওনা, কচুয়া, কালিদাস, বহেড়াতৈল, কুতুবপুর, কাকড়াজান, বোয়ালী ও তক্তারচালা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেক খামারের গরু এ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি, জ্বর, ক্ষত ও দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও চিকিৎসার আগেই গরু মারা যাচ্ছে বলে খামারিরা জানান।
খামারিদের ভাষ্য, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাঁদের দাবি, কমপক্ষে ১৫ টি গরু মারা গেছে। এদিকে কচুয়া গ্রামে গত এক মাসে অন্তত তিনটি গরু মারা যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
প্রতিষেধক সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক খামারি পল্লি পশুচিকিৎসক কিংবা স্থানীয় কবিরাজদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এতে ভুল চিকিৎসা, নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। অনেক কৃষক রোগ সম্পর্কে আগে থেকে সচেতন না থাকায় সময়মতো ভ্যাকসিন দিতে পারেননি। ফলে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
কচুয়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম মিয়া বলেন, "হঠাৎ করেই গরুর শরীরে গুটি দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি জানান, আগেই ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত ছিল। চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ করেও শেষ পর্যন্ত গরুটিকে বাঁচাতে পারিনি।"
আক্কাছ নামের এক খামারি অভিযোগ করে বলেন, "গরু আক্রান্ত হওয়ার খবর দেওয়ার পরও অনেক সময় প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজন আসেন না। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনও পাওয়া যায় না। সম্প্রতি আমার একটি ও পাশের বাড়ির মোংলা মিয়ার একটি বাছুর মারা গেছে।"
তবে বেপারীপাড়া গ্রামের মাজেদা খাতুন জানান, গরু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রায় চার হাজার টাকা খরচ করে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করান। বর্তমানে তাঁর গরুটি সুস্থ হওয়ার পথে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানাযায়, লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত মশা ও মাছির মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত গবাদিপশুকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, "গত এপ্রিল, মে ও জুন মাসে উপজেলায় দুই শতাধিক গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে কোনো গরু মারা গেছে তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করছি।"
তিনি আরও বলেন, "লাম্পি স্কিন ডিজিজের সরকারি ভ্যাকসিন খুব সীমিত পরিমাণে আসে, সেটিও তিন মাস পরপর। একটি উপজেলার চাহিদার তুলনায় এ সরবরাহ যথেষ্ট নয়। তাই অনেক সময় বাইরে থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হয়। আক্রান্ত হওয়ার আগেই গরুকে ভ্যাকসিন দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর। আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত সঠিক চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ গরুই সুস্থ হয়ে ওঠে।"
তিনি আরও বলেন, "আক্রান্ত গরুকে গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছে না নিয়ে সরাসরি প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে এনে পরামর্শ নেওয়া উচিত। গরু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে, তবে এ বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় না।"
খামারিদের দাবি, রোগ নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ওষুধ, টিকা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।
এসআর