টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে অবৈধ দখল, নদীর চর কাটা, দালালচক্র ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে আলোচনায় আসা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেনকে বদলি করেছে সরকার। সম্প্রতি যুবদল নেতাসহ অবৈধ মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সাজা দেওয়ার পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন এই এসিল্যান্ড।
গত বুধবার (১৩ মে) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ভূঞাপুর থেকে সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, ঢাকায় উপপরিচালক পদে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে আগামী ১৮ মের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ভূঞাপুরে দায়িত্ব পালনকালে এসিল্যান্ড রাজিব হোসেন প্রশাসনিক কঠোরতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জনবান্ধব নানা উদ্যোগের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। বিশেষ করে যমুনা নদীর চর কেটে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে তার নেতৃত্বে পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযান এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গত ৪ মে নিকরাইল ইউনিয়নের পলশিয়া এলাকায় দীর্ঘ ৬ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মতিন নামে এক যুবদল নেতাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও চারজনকে মোট চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৮টি ব্যাকহো মেশিন ও ৩টি ট্রাক জব্দ করা হয়। অভিযানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব হাসানের সঙ্গে সরাসরি নেতৃত্বে ছিলেন এসিল্যান্ড রাজিব হোসেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র প্রকাশ্যে নদীর চর ও পাড় কেটে মাটি বিক্রি করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু রাজিব হোসেন ভূঞাপুরে আসার পর অবৈধ মাটি কাটা, দখল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান শুরু হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী।
জানা যায়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয় এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে তাতেও তাকে অবস্থান থেকে সরানো সম্ভব না হওয়ায় সম্প্রতি যুবদল নেতাকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ মে সকালে উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে হাতে গোনা কয়েকজন নারীকে নিয়ে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সাবেক কাউন্সিলর রাশেদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বক্তব্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেনের কঠোর সমালোচনা করেন। এরই মধ্যে গত বুধবার রাতে তার বদলির খবর প্রকাশ পায়।
এদিকে ভূঞাপুর থেকে এসিল্যান্ড রাজিব হোসেনের বদলির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতে শুরু করেন নেটিজেনরা। অনেকেই এটিকে “সৎ ও কঠোর প্রশাসনের বিদায়” হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভূঞাপুরে দায়িত্ব পালনকালে রাজিব হোসেন শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই নয়, বরং একজন দৃঢ় ও জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দালালমুক্ত ভূমি সেবা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বাজার মনিটরিং ও জনস্বার্থে একের পর এক উদ্যোগ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। ফলে তার বদলির খবরে একদিকে সুবিধাভোগী মহল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।
তবে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার জুলহাসের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অন্যায়ভাবে যুবদল নেতাকে সাজা দিয়ে টিকে থাকতে পারলেন না। ক্ষমতার অপব্যবহারকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। দোয়া রইল, ভালো থাকবেন। সর্বোপরি মঙ্গল কামনা করি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জুলহাসের ওই স্ট্যাটাসের মাধ্যমে প্রশাসনের আইনানুগ কার্যক্রমকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের মতে, “টিকে থাকতে পারলেন না” মন্তব্যের মাধ্যমে যুবদল নেতাকে সাজা দেওয়ার ঘটনাকেই এসিল্যান্ডের বদলির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে শনিবার (১৬ মে) দুপুরে এসিল্যান্ড রাজিব হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, 'পদোন্নতি পেয়ে ভূঞাপুর ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিচ্ছি। ভূঞাপুর উপজেলাবাসীর জন্য শুভকামনা।'
এইচএ