কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক সড়কের পাশে ছোট একটি বটগাছের নিচে বসে আছেন ৭০-ঊর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখনো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সড়কের দিকে। জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে কখনো গাছে হেলান দিয়ে, কখনো মাটিতে বসেই সময় কাটে তাঁর। কাজ নেই, ওষুধ খাওয়ার টাকাও নেই জীবিকার তাগিদে তাই রাস্তার পাশে বসেই দিন কাটছে বৃদ্ধ সিরাজের।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পৌর এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে সিরাজ।
পেশায় তিনি সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কারিগর। বর্তমানে বিদ্যুৎচালিত মোটরযানের প্রচলন বেড়ে যাওয়ায় তাঁর পেশায় দেখা দিয়েছে দুর্দিন। কিন্তু জীবন ও জীবিকা তো আর থেমে থাকে না। রোগাক্রান্ত শরীরের জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন ওষুধ। পাশাপাশি রয়েছে জীবিকার তাগিদ। সীমাহীন কষ্ট ও অভাবের কষাঘাতে চলছে সিরাজের জীবন।
জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর ধরে কটিয়াদী থানার সামনে এই পেশায় ছিলেন তিনি। গত ১৫ বছর ধরে চড়িয়াকোনা মোড়ে সড়কের পাশে বসেন। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সবার বিয়ে হয়েছে। গত কোরবানির ঈদের পর মারা গেছেন তাঁর স্ত্রী। ছেলেরা যে যার মতো সংসার করছেন। বর্তমানে ছোট ছেলের সঙ্গে থাকেন সিরাজ। কিন্তু অভাবের সংসারে বসে না থেকে নিজেই জীবনসংগ্রামে লড়ছেন।
বর্তমানে আগের মতো সাইকেল, রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ নেই। বিদ্যুৎচালিত মোটরের মাধ্যমে চলাচল করায় এসব যানবাহনের ব্যবহার কমেছে। তবে বিকল্প কোনো কাজ জানা না থাকায় পুরোনো পেশাটিই এখনো তাঁর শেষ সম্বল। প্রতিদিন আয় হয় ৮০ থেকে ১৫০ টাকা। কাজ বন্ধ থাকলে আয়ও বন্ধ। শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪০ টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। নিয়মিত ইনহেলার ও ওষুধও ব্যবহার করতে হয় তাঁর। এনআইডি কার্ডে বয়সের বিভ্রাটের কারণে বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছেন না সিরাজ। তাঁর প্রকৃত বয়স ৭১ বছর হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ৬১ বছর।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার চড়িয়াকোনা কাঠমহাল মোড়ে ছোট একটি বটগাছ ও বিদ্যুতের পিলারে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন বৃদ্ধ সিরাজ। পাশে রাখা সাদা বস্তায় তাঁর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। ভোর ৭টায় কাজে এসে সকাল ১০টা পর্যন্ত আয় হয়েছে মাত্র ২০ টাকা। তবুও সড়কের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন তিনি হয়তো কেউ আসবেন, কোনো কাজ হবে, এই আশায়।
ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রতিদিন এভাবেই বসে থাকেন সিরাজ। জীবনের অতীতের গল্প বলতে গিয়ে মুখে ছিল সাদাসিধে হাসি। অথচ চোখে দুঃখের ছাপ, বুকে অভাবের কষ্ট।
স্থানীয় অটোরিকশাচালক আব্দুল মতিন বলেন, ‘সিরাজ চাচা খুবই সাদাসিধে মানুষ। একসময় সাইকেল-রিকশা মেরামতের কাজ অনেক হতো। এখন কাজ তেমন নেই। তবুও প্রতিদিন বসে থাকেন তিনি। অভাবের কথা কাউকে বলেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করেন। সরকার ও সমাজের দানশীল মানুষের সহায়তা পেলে তাঁর উপকার হতো।’
বৃদ্ধ সিরাজ বলেন, ‘শরীরে নানান রোগশোক আছে। ডাক্তার দেখানোর টাকাও নাই। একবার ডাক্তার দেখানোর পর শ্বাসকষ্টের ওষুধ দিছে। প্রতিদিন ওষুধ লাগে। ছেলেদের ওপর বোঝা হয়ে না থেকে নিজেই যা পারি করছি। কাজ তো আর জানা নাই, তাই এটা নিয়ে বসে আছি। আল্লাহ কপালে যা রাখছে, তাতেই সন্তুষ্ট আমি। ভালো থাকি বা কষ্টে—জীবন তো চলে যাবেই।’
এসআর