এইমাত্র
  • নাগরপুরে ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্বোধন
  • জীবননগরে চাঁদাবাজি-মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের হুমকির অভিযোগ
  • দুই সিস্টেমে দুই তথ্য, হদিস নেই কোটি টাকার কন্টেইনারের!
  • দুর্গাপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে জখম
  • শিক্ষকরা নির্বাচন করতে চাইলে চাকরি ছাড়তে হবে: শিক্ষামন্ত্রী
  • অর্থনৈতিক করিডরের উপকার ৩ দেশই পাবে: চীনা রাষ্ট্রদূত
  • বাংলাদেশের অভ‍্যন্তরীণ ইস্যুতে চীন কারো হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না: রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন
  • আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুল বর্ষ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
  • হজের প্রাক-নিবন্ধনে দিতে হবে যেসব তথ্য
  • শরীরে বাদুড় বসার পর জলাতঙ্কে ১১ বছরের শিশুর মৃত্যু
  • আজ বৃহস্পতিবার, ১৮ আষাঢ়, ১৪৩৩ | ২ জুলাই, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    চট্টগ্রাম বন্দর

    দুই সিস্টেমে দুই তথ্য, হদিস নেই কোটি টাকার কন্টেইনারের!

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

    দুই সিস্টেমে দুই তথ্য, হদিস নেই কোটি টাকার কন্টেইনারের!

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

    দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে দুইটি ৪০ ফুট দীর্ঘ আমদানিকৃত কন্টেইনার রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বন্দরের নিরাপত্তা, কন্টেইনার ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি। তদন্তে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য, যা শুধু একটি সাধারণ চুরির ঘটনা নয়; বরং সুপরিকল্পিত জালিয়াতি, নথি জাল, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কন্টেইনার ডেলিভারি ব্যবস্থার একাধিক স্তর ভেঙে সংঘটিত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি কন্টেইনার বাস্তবে বহু আগেই বন্দর এলাকা থেকে বেরিয়ে গেলেও বন্দরের নিজস্ব ওরাকল (Oracle) সিস্টেমে সেটি এখনও ইয়ার্ডে সংরক্ষিত রয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) বলছে, কন্টেইনারটি অনেক আগেই ডেলিভারি হয়ে গেছে। একই কন্টেইনার নিয়ে দুটি সরকারি ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য থাকার বিষয়টি তদন্ত সংশ্লিষ্টদেরও বিস্মিত করেছে।

    এই দুই ঘটনায় নিখোঁজ পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রথম ঘটনায় দীর্ঘ দশ মাস তদন্তের পর শুধু খালি কন্টেইনার উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ভেতরের পণ্যের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ঘটনায় এখনও পুরো কন্টেইনারই নিখোঁজ।

    প্রথম ঘটনায় জানা যায়, ঢাকার গাজীপুরের মুয়াজ উদ্দিন টেক্সটাইল চীন থেকে ফেব্রিক্স আমদানি করে। পণ্যবোঝাই ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেইনারটি গত বছরের ৪ আগস্ট বার্থ অপারেটর বশির আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে বন্দরের জেআর ইয়ার্ডে সংরক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ সময় কন্টেইনারটি সেখানে থাকার পর চলতি বছরের ২ এপ্রিল কাস্টমস কর্তৃক কায়িক পরীক্ষা শেষে ডেলিভারির জন্য কন্টেইনারটি বের করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইয়ার্ডে গিয়ে কন্টেইনারটির কোনো অবস্থান খুঁজে পাননি। দিনভর অনুসন্ধান চালিয়েও কন্টেইনারটি উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট বাতিল করা হয়।

    ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করলে তদন্ত শুরু করে বন্দর থানা পুলিশ। তদন্তে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৪ জুন নগরীর হালিশহর এলাকার আব্বাসপাড়ার গলাচিপা এলাকা থেকে খালি কন্টেইনারটি উদ্ধার করা হয়। তবে কোটি টাকার পণ্য কোথায় গেছে, কারা সরিয়েছে এবং কোথায় বিক্রি করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

    প্রথম ঘটনার তদন্ত চলমান অবস্থায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে আসে। ঢাকার খিলক্ষেত সুপার মার্কেটের ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোজিট লিমিটেড চীন থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ফেব্রিক্স আমদানি করে। কন্টেইনারটি চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জাহাজ থেকে খালাস করে চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ইয়ার্ডে রাখা হয়। পরবর্তীতে ২৮ এপ্রিল কাস্টমস কর্তৃক পণ্য পরীক্ষার জন্য কন্টেইনারটি অ্যাসাইনমেন্টভুক্ত করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত দিনে ইয়ার্ডে গিয়ে কন্টেইনারটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

    এ ঘটনার পর কন্টেইনারটির অবস্থান জানতে ৬ মে টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১০ মে দেওয়া জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কন্টেইনারটি ১৭ মার্চ অনডেট অনচেসিস পদ্ধতিতে দ্রুত খালাসের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমে সেটি ডেলিভারি দেখানো হয়েছে।

    কিন্তু এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি। বন্দরের নিজস্ব ওরাকল সিস্টেমে একই কন্টেইনার এখনও সিসিটি ইয়ার্ডে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তথ্য সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ একটি সরকারি তথ্যব্যবস্থা বলছে কন্টেইনারটি বন্দরে আছে, অন্যটি বলছে সেটি অনেক আগেই বের হয়ে গেছে।

    এরপর কন্টেইনারটির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে তদন্তকারীরা একের পর এক জালিয়াতির তথ্য পান।

    মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অনডেট ও অনচেসিস অ্যাসাইনমেন্টের কপিতে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সৈয়দ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান-এর পরিবর্তে ভুলভাবে সৈয়দ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানিয়েছেন, নথিতে থাকা সিল ও স্বাক্ষর কোনোটিই তার নয়। তার নাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জাল কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে।

    শুধু তাই নয়, পরিবহন পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম এবং উচ্চমান বহিঃসহকারী এমএইচ সিরাজীর নামে থাকা স্বাক্ষরও ভুয়া বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, পুরো ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত একাধিক অনুমোদনপত্র, সিল এবং স্বাক্ষর জাল করে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে।

    তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে এসেছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের বিষয়টি। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) যাচাই করে দেখা যায়, বন্দরের এফসিএল শাখার কর্মচারী মোকাদ্দেস হোসেন অন্য একজনের আইডি ও পাসওয়ার্ড অবৈধভাবে ব্যবহার করে চলতি বছরের ১৭ মার্চ রাত ২টা ৫৪ মিনিটে কন্টেইনারটির তথ্য সিস্টেমে প্রবেশ করান। ওই একই সময়ে টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ইক্যুইপমেন্ট অপারেটরের সহায়তায় কন্টেইনারটি নামানো হয় এবং পরবর্তীতে বন্দরের গেট দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।

    তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি, ঠিক কোন সময়ে কন্টেইনারটি বন্দর ত্যাগ করেছে কিংবা গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় কারা দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

    প্রথম ঘটনায় গত ৭ এপ্রিল বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলাটি বন্দর থানায় মামলা নম্বর-৯ হিসেবে রুজু হয়। এতে দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় জেআর ইয়ার্ডের ইনচার্জ মিজানুর রহমান, ক্রেন অপারেটর আবু সুফিয়ান, কন্টেইনার বহনকারী লং ভেহিকেলের হেলপার রুবেল এবং দুলালকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রুবেলকে ঢাকার আশুলিয়া থেকে এবং দুলালকে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত আরও একজন এখনও পলাতক রয়েছেন।

    অন্যদিকে দ্বিতীয় ঘটনায় প্রতারণা, জালিয়াতি ও বিভিন্ন ফৌজদারি ধারায় মামলা হয়েছে। এ মামলায় নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

    দ্বিতীয় ঘটনায় টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ভূমিকাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ কন্টেইনারটির অবস্থান সম্পর্কে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আনলেও, একই সঙ্গে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে অবৈধ সিস্টেম এন্ট্রির সময় প্রতিষ্ঠানটির ইক্যুইপমেন্ট অপারেটরের সহায়তায় কন্টেইনারটি নামানো হয়েছিল। তবে কোন কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি চূড়ান্তভাবে ডেলিভারির অনুমোদন দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

    এই প্রসঙ্গে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, দুটি ঘটনাই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রথম ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খালি কন্টেইনার উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায় কাপড়ভর্তি কন্টেইনার কীভাবে বন্দর এলাকা থেকে বের হয়ে গেল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং পণ্য কোথায় নেওয়া হয়েছে, এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

    ইখা

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…