মাসের দশ তারিখ না পেরোতেই পকেট শূন্য। বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়ার খরচ আর দেনা শোধ করতেই শেষ কষ্টার্জিত টাকা। কিন্তু চুলা তো রোজ জ্বালাতেই হবে। রাজধানীর উত্তরা ও এর আশপাশের এলাকার লাখো নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা এখন এমনই। আয়ের বড় অংশ খাদ্যে চলে যাওয়া আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চরম অসামঞ্জস্যে দিশেহারা পরিবারগুলোর শেষ সম্বল হয়ে উঠেছে মহল্লার মুদি দোকানের বাকির খাতা।
উত্তরার আজমপুর, আব্দুল্লাহপুর, খিলক্ষেত ও তুরাগ এলাকার একাধিক মহল্লার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায় নগদ টাকার চেয়ে বাকির লেনদেনই বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির যে পারদ চড়ছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এসব পরিবারের দৈনন্দিন তালিকায়। আয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই চলে যাচ্ছে শুধু চাল, ডাল ও তেলের পেছনে। ফলে ডিম কিংবা পাঙ্গাশ-তেলাপিয়ার মতো সস্তা মাছও এখন নগদ টাকায় কেনা সম্ভব হচ্ছে না; ঠাঁই পাচ্ছে বাকির ফর্দে।
তুরাগের এক পোশাক কারখানার শ্রমিক মো. রফিকুল জানান, ১৫ তারিখের পর পকেটে আর এক টাকাও থাকে না। বাসা ভাড়াই চলে যায় আয়ের অর্ধেক। পূর্ণ কেজি মেপে কেনার সামর্থ্য নেই বলে আধা পোয়া তেল আর ১০০ গ্রাম ডালও দোকানদারের কাছে বাকিতে চাইতে হয়। মহল্লার দোকানদার বাকিতে না দিলে পরিবার নিয়ে উপাস থাকতে হতো।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা গার্মেন্টস কর্মী মোসাম্মাৎ পারভীন আক্তার বলেন, বেতন পাই মাসের এক তারিখ, আর পাঁচ তারিখের মধ্যে ঘর ভাড়া আর আগের মাসের মুদির বাকি মিটাতেই পকেট খালি। এর পর থেকে বাকি মাসটা বলতে গেলে দোকানদারের দয়ার ওপর চলতে হয়। বাচ্চার দুধ বা ডিমের টাকাটাও বাকির খাতায় তুলতে লজ্জা লাগে, কিন্তু উপায় তো নেই।
আব্দুল্লাহপুর এলাকার এক মুদি দোকানদার জানান, প্রতিদিন বাকির খাতার পাতা ভরলেও সময়মতো টাকা উঠছে না। তিনি বলেন, পরিচিত গ্রাহকদের খালি হাতে ফেরানো যায় না। কিন্তু আগের মতো কেউ কেজি বা লিটার মেপে কেনেন না, অল্প অল্প করে ছোট প্যাকেটে কেনেন।বকেয়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ায় আমাদের মতো খুচরা বিক্রেতারাও এখন বড় আর্থিক কষ্টে আছি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেকে আবার ব্র্যাক বা স্থানীয় এনজিওর কিস্তি ও ক্ষুদ্র ঋণের ওপর নির্ভর করছেন। দোকান বাকি শোধ করতে গিয়ে ঋণের আরেক নতুন চক্র তৈরি হচ্ছে।
আজমপুর এলাকার মুদি দোকানদার মো. সামসুল হক বলেন, কাস্টমারদের তো বহু বছর ধরে চিনি, তারা ইচ্ছা করে বাকি রাখে না চলতে পারে না বলেই চায়। কিন্তু আমাদের তো পাইকারি বাজার থেকে নগদে মালামাল কিনতে হয়। কাস্টমারের কাছে লাখ টাকার ওপরে বকেয়া পড়ে আছে, মহাজনকে টাকা দিতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে দোকান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষক ড. তৌহিদুর রহমান জানান, উত্তরার মতো ব্যয়বহুল এলাকায় বাসা ভাড়া ও জীবনযাত্রার চাপ তুলনামূলক বেশি। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির বিপরীতে নিম্নবিত্তের আয় না বাড়ায় তাদের সঞ্চয় ক্ষমতা এখন শূন্যের কোঠায়। জরুরি ভিত্তিতে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী পদক্ষেপ ও সরকারি টিসিবি পণ্যের ব্যাপ্তি না বাড়ালে এ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের নগর হিসেবে পরিচিত হলেও, আবদুল্লাহপুর, তুরাগ বা খিলক্ষেত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক পোশাক শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের বাস। এই বৈষম্যমূলক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম উত্তরার সামগ্রিক খরচের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়, যা নিম্নবিত্তের জন্য চরম অন্যায়। প্রকৃত আয় না বাড়ায় এখানকার খেটে খাওয়া মানুষের শেষ সম্বল এখন স্থানীয় মুদি দোকানের 'বিকাশ বা বাকির হিসাব। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এদেরকে দীর্ঘমেয়াদি এক অদৃশ্য ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে।
ইখা