এইমাত্র
  • মনপুরায় সংবাদ প্রকাশের জের, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যুবদল নেতার মামলা
  • নতুন পে স্কেলে বেতন অনেক বেশি বাড়বে, তেমনটা নয়: তথ্য উপদেষ্টা
  • শার্শায় দুই দিনে কুকুরের কামড়ে আহত অর্ধশতাধিক
  • বেতনের আগেই নিঃশেষ পকেট, নিম্নবিত্তের ভরসা বাকির কেনাকাটা
  • বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অতীতে আটকে থাকার সুযোগ নেই: ভারতের হাইকমিশনার
  • কিশোরগঞ্জে ‘কিডন্যাপ’ হওয়া নববধূর ভিডিও বার্তা: ‘আমি আইছি, এনেই থাকবাম’
  • সালমান এফ রহমানের পক্ষে লড়তে চান ব্রিটিশ আইনজীবী
  • শাহজালালে অরক্ষিত শত কোটি টাকার পণ্য, নির্বিকার কর্তৃপক্ষ!
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির একক প্রার্থী নিশ্চিত করা হবে: ভূমিমন্ত্রী
  • তারাগঞ্জ-বুড়িরহাট সড়কের বেহাল দশা, ৪ কিলোমিটার জুড়ে গর্ত
  • আজ মঙ্গলবার, ১৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’: কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে সিডিএর বিশাল পরিকল্পনা

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

    ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’: কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে সিডিএর বিশাল পরিকল্পনা

    গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

    কর্ণফুলী নদীর ওপারে শুধু যে শিল্পায়নের চাকা ঘুরছে তা নয়, এবার সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ আধুনিক ও পরিকল্পিত নতুন শহর। উর্বর কৃষিজমিকে ধ্বংস না করে, বরং বহুফসলি জমিকে সুরক্ষার বলয়ে রেখে দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে এই নতুন ‘স্যাটেলাইট টাউন’ গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

    নদীর উত্তর তীরের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ওপর থেকে আবাসন, যানজট এবং ঘনবসতির চাপ কমিয়ে আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫–২০৫০-এর আওতায় প্রণীত ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’-এ বহুল আলোচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বা ‘এক নগর দুই শহর’-এর বাস্তব রূপরেখা উন্মোচিত করা হয়েছে।ব

    কর্ণফুলী টানেল চালুর পর থেকেই দক্ষিণ তীরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। টানেল এবং ৬ লেনের সংযোগ সড়ক ধরে এই মেগা পরিকল্পনা বিস্তৃত হচ্ছে বাঁশখালী ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান এলাকার প্রায় ৭ হাজার ৩১৫ দশমিক ৫ একর জমিজুড়ে বিশাল এই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে।

    সিডিএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস হলেও ২০৫০ সাল নাগাদ এই নতুন শহরে বাস করবে ৭ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের পরিধি বর্তমানের প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৩-এ। চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, কোরিয়ান ইপিজেড এবং কাফকোর মতো বড় শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের জন্য এই শহরটি হবে এক বিশ্বমানের ঠিকানা।

    তবে এই বিশাল নগর গড়ার ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা এলাকার প্রায় ৫৭ শতাংশ জমিই বর্তমানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৪ হাজার ১৪৭ একর মোট কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩৮৮ একর জমিকে পুরোপুরি অস্পর্শনীয় রেখে সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিডিএ সূত্রে জানানো হয়েছে, এলাকার কোনো দুই বা তিন ফসলি জমির ক্ষতি করা হবে না। কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখে বাকি প্রায় ২ হাজার ৮৮২ একর বা ৩৯ শতাংশ জমিতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, মিশ্র ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সবুজ এলাকার সমন্বয়ে নতুন নগর গড়ে তোলা হবে। এছাড়া ভারী শিল্পের জন্য সাড়ে সাত শতাংশ বা ৫০০ একরের কিছু বেশি জমি প্রস্তাবিত থাকলেও শহরের আবাসিক সীমানার ভেতরে কেবল কুটির ও সহায়ক শিল্পের সুযোগ রাখা হচ্ছে।

    নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে নতুন শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। প্রস্তাব করা হয়েছে মোট ৪৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে ১১ কিলোমিটারের বেশি প্রাইমারি ডিস্ট্রিবিউটর সড়ক, ২১ কিলোমিটারের বেশি সেকেন্ডারি এবং ১৫ কিলোমিটারের বেশি লোকাল সড়ক থাকবে। মোট ১৯ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়ক ৪০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন সহজ করতে আনোয়ারা-পটিয়া সড়ককে ১৬০ ফুট পর্যন্ত চওড়া করা হবে এবং আর-১৭০ সড়কটিকে মাতারবাড়ী-চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগকারী মূল করিডর হিসেবে শক্তিশালী করা হবে। শিল্পাঞ্চলের ভারী যানবাহনের কারণে যাতে যানজট না হয়, সে জন্য ২৪ দশমিক ৫ একর জায়গাজুড়ে ১ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতার বিশাল ট্রাক টার্মিনাল এবং ৩ দশমিক ২ একর জায়গায় আঞ্চলিক বাস টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে কমিউটার রেল যোগাযোগের সুযোগও রাখা হয়েছে।

    একটি পূর্ণাঙ্গ মানসম্মত শহরের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার হিসাব রাখা হয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। ২০৫০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যার সেবা নিশ্চিত করতে ৮টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, ৯টি ক্লিনিক, একটি ৬ একরের বড় হাসপাতাল এবং ১৮টি আধুনিক কিচেন মার্কেট তৈরি করা হবে। নাগরিকদের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য ২০ একর জমি খেলার মাঠ এবং ৪০ একর জমি পার্ক ও লেকের জন্য রাখা হয়েছে। কালা বিবির দীঘি, মনু মিয়ার দীঘি ও মুরালী খালের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলোকে অক্ষত রাখার পাশাপাশি ওয়াসা, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক জমি বরাদ্দ রাখা নিশ্চিত করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম মেনে ভবনের উচ্চতা ও ঘনবসতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে নগরটি ঘিঞ্জি রূপ না নেয়।

    তিনটি পৃথক ধাপে (প্রথম ধাপ ২০২৫-২০৩৫, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩৫-২০৪৫ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫-২০৫০ সাল পর্যন্ত) এই সুবিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। তবে অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভিটেমাটি হারানো স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আনোয়ারা পেশাজীবী পরিষদের প্রতিনিধিরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কৃষিজমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

    এ প্রসঙ্গে সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী জানান, "কর্ণফুলীর দক্ষিণ অংশে দিন দিন নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা ও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সুপরিকল্পিত একটি নতুন নগরী উপহার দিতে আমরা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছি। আনোয়ারার চাতরী, বৈরাগ ও বারখাইন এবং কর্ণফুলীর বড়উঠান ইউনিয়নের অংশবিশেষ এই মেগা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য, উর্বর কৃষিজমি যতটা সম্ভব অক্ষত রাখা এবং স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা। বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে এই প্রস্তাবিত এলাকা থেকে মূল চট্টগ্রাম শহরের দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটের; অন্যদিকে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গেও রয়েছে চমৎকার সংযোগ। ফলে এই প্রকল্প ঘিরে সর্বস্তরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমরা সব স্টেকহোল্ডারদের মতামত সংগ্রহ করছি।"

    একই প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সিডিএ একটি অত্যাধুনিক ‘স্যাটেলাইট টাউন’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমানে গণশুনানি ও মতামত গ্রহণের পর্ব চলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের গেজেট প্রকাশের পরপরই আমরা মূল অবকাঠামো নির্মাণ ও রূপরেখা বাস্তবায়নের কাজে নেমে পড়ব। আনোয়ারায় ইতিমধ্যে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব গড়ে উঠেছে এবং চায়না ইকোনমিক জোনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগকারী এখানে অবস্থান করবেন। তাই দেশি-বিদেশি, উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান বিচারে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ দিয়ে এটিকে একটি মডেল টাউনে রূপ দেওয়া হবে। এই শহর বাস্তবায়িত হলে মূল চট্টগ্রাম নগরীর ওপর জনসংখ্যার চাপ ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।

    পিএম

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…